সফিকুল ইসলাম (স্টাফ রিপোর্টার লালমনিরহাট):
গত ১৭-০২-২০২৪ইং রাত ০৪:৩০-০৫:০০ ঘ. পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী বিওপির দায়িত্বাধীন কলাবাগান এলাকায় বিজিবি টহল দল কর্তৃক অবৈধভাবে নিয়ে আসা ১২ বস্তা ভারতীয় শাড়িসহ একটি পাথরভর্তি ট্রাক (WB 25-B-3570) পরিত্যক্ত অবস্থায় আটক করে।
উক্ত ঘটনায় বিজিবি বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করে যেখানে বাংলাদেশি সিএন্ডএফ মেসার্স জামান এন্ড ব্রাদার্স, আমদানিকারক মেসার্স তানজিনা এন্টারপ্রাইজ, ভারতীয় সিএন্ডএফ মেসার্স সওদাগর এক্সপোর্ট ও ভুটানি রপ্তানিকারক মেসার্স জননী ট্রেডার্স সহ ট্রাকের ড্রাইভার আশরাফ আলী আহম্মেদ কে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও ভুটানি পাথরসহ ভারতীয় ট্রাকটি চোরাচালানকালে জব্দকৃত পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, চোরাচালান হলো সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য আমদানি করা। আর যথাযথভাবে শুল্কায়িত বৈধ পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্যের আমদানিকে “মিস ডিক্লিয়ারেশন” বা মিথ্যা ঘোষণা বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে, বিজিবি কর্তৃক সম্প্রতি আটককৃত ভুটানি পাথরবাহী ভারতীয় ট্রাকের ক্ষেত্রে মিস ডিক্লিয়ারেশন বা মিথ্যা ঘোষনার ঘটনাই ঘটেছে। এমতাবস্থায়, কাস্টমস কর্তৃক পানামা ছাড়পত্র পাওয়া পাথরবাহী বৈধ ট্রাক ও যথার্থভাবে শুল্ক পরিশোধ করা পাথর কেন মামলার আওতাধীন করা হলো, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে আমদানিকারক ও ট্রাক ড্রাইভারের ভাষ্যমতে, উক্ত পাথর ভর্তি ট্রাকটি পানামায় অবস্থানকালে দেলোয়ার হোসেন, পিতা- আব্দুল জব্বার, সাং- কামারপাড়া, বুড়িমারী, পাটগ্রাম এর মধ্যস্থতায় আমজাদ হোসেন, পিতা- ইসহাক আলী, সাং- মাছির বাজার (আদর্শ পাড়া), বুড়িমারী, পাটগ্রাম এর নিকট বিক্রি করা হয়। এরপর স্থলবন্দরের প্রক্রিয়া শেষে বিকাল ০৫:০০ ঘটিকার দিকে মালামাল আনলোডের জন্য শ্রমিকদের সিরিয়াল পায়। তবে পরবর্তী দিন মালামাল আনলোডের অজুহাতে সিরিয়াল প্রাপ্ত শ্রমিকদের ডেকে নেয়া হবে বলে ট্রাক ড্রাইভার শ্রমিকদের চলে যেতে বলে।
ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারের বরাতে আরও জানা যায়, ট্রাকটিতে মোট ৪২ টি কাপড়ের বস্তা ছিল যার মধ্যে কিছু অংশ জে. এম ফিলিং স্টেশনের বিপরীত পাশে অবস্থিত আমজাদ হোসেনের পাথরের সাইটে আনলোড করা হয় এবং বাকি অংশ আনলোডের জন্য রাত ০২:৩০ ঘটিকার দিকে কলাবাগান এলাকার মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, প্রোঃ বাবু ও জামান এর পাথরের সাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। তার কিছুক্ষণ পরই ঘটনাস্থলে পুলিশের আগমন ঘটে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ট্রাকের ড্রাইভারসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত কলাবাগান এলাকার কুতুবুল, পিতা- হাফিজার, রুমেল, পিতা- সহিদার, জুয়েল, পিতা- কালটু সহ আরও অনেকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তাদেরকে ভাগিয়ে দিতে পার্শ্ববর্তী পাথরের সাইটের জামান রুবেল ও তার সাইটের অন্যান্য স্টাফরা পুলিশকে সহযোগিতা করে। পরবর্তীতে, জুয়েল, পিতা- কালটু এর বাড়ি থেকে পুলিশ ০৬ (ছয়) বস্তা মালামাল উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানেও (কিন্তু) রয়ে গেছে। পুলিশ সম্পূর্ণ মালামাল জব্দ না করে বাকি মালামাল সহ পাথর ভর্তি ট্রাকটি রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করল কেন, এ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেল।
পুলিশের ঘটনাস্থল ত্যাগের আনুমানিক আরও আধাঘন্টা পর ঘটনাস্থলে বিজিবির আগমন হয়। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় বিজিবি ১২ বস্তা মালামাল সহ পাথর ভর্তি ট্রাক আটক করে। বুড়িমারী স্থলবন্দর কাস্টমসের নির্ধারিত এলাকার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে অথচ কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে জব্দকৃত মালামাল হস্তান্তর করা হয়নি! ৬১ বিজিবি’র সিও এর নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে পাথর ভর্তি ট্রাক সহ জব্দকৃত মালামাল ৬১ বিজিবি’র ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টারে নেয়া হয়।
পরবর্তীতে জব্দকৃত মালামাল জনসম্মুখে প্রকাশ করা ও শুল্কায়ন যোগ্য মূল্য নির্ধারণের দাবি নিয়ে কাস্টমসের প্রতিনিধি বিজিবি’র ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত হলে তাকে মৌখিকভাবে মালামালের পরিমাণ ও বিজিবি কর্তৃক এককভাবে নির্ধারিত দাম জানিয়ে দেয়া হয়। ঘটনার ১৪ দিন অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি বিজিবি’র পক্ষ থেকে কোন প্রেস ব্রিফিং অথবা নিয়মানুসারে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে অবহিত করা হয়নি।
এদিকে, পলাতক ট্রাক ড্রাইভার ঘটনার পর দুইদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে, বুড়িমারী বাজারে কাপড়ের ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেনের ভগ্নিপতি ও সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী আলী হোসেন সহ কতিপয় সিএন্ডএফ এজেন্ট উক্ত ড্রাইভারকে গোপনে ভারতে পালিয়ে যেতে সহযোগীতা করেন বলে ট্রাক ড্রাইভার সূত্রে জানা যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জামান এন্ড ব্রাদার্স এর প্রোপ্রাইটর জনাব আবেদার জামানের লাইসেন্স অথরাইজ করে ১৯৯৯-২০২১ইং সাল পর্যন্ত মেসার্স এইচ.এল ট্রেডিং এর প্রোপ্রাইটর জনাব হুমায়ূন কবির সওদাগর ব্যবসা করেন। এ সময়কালে লাইসেন্সের বিপরীতে মোটা অংকের সরকারি রাজস্ব বকেয়া হলে লাইসেন্সটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে, ২০২১ইং সালের ডিসেম্বরে লাইসেন্সটি নবায়ন করে মেসার্স তারকা ট্রেডার্স এর প্রোপ্রাইটর জনাব মানিকুর রহমান মানিক কে অথরাইজেশন দেয়া হয়। এ নিয়ে উভয় আমদানিকারকের মধ্যে দীর্ঘদিনের অন্তর্দন্দ রয়েছে বলে জানা যায়।
এই সকলের মূলে একটি কুচক্র মহল দীর্ঘদিন থেকে বুড়িমারী স্থল বন্দরকে অকার্যকর করার জন্য বিভিন্নভাবে চক্রান্ত করছেন। এই স্বার্থান্বেষী মহল কারা কেনইবা চক্রান্ত করছেন, জনসম্মুখে এদের মুখোশ উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।